
Macau যাকে কিনা বলা হয় এশিয়ার লাসভেগাস, 1999 সাল পর্যন্ত পর্তুগালের অধীনে ছিল, পরবর্তীতে যা চায়নার অধীনে চলে আসে। চায়নার অধীনে আসলেও মেকাও এর নিজস্ব কারেন্সি আছে ,যাকে ম্যাকাও ডলার বলা হয়। ম্যাকাও তে পর্তুগিজ, চাইনিজ , ফিলিপিনো এবং তাইওয়ানেসের এক মিলন মেলা বলা হয়। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় 250 ADC তে মাছ ধরার জেলেরা আসতো ফুজিয়ান থেকে এবং ফার্মার এসেছে Guangdong থেকে। তখন এখানে Ou Mun কিংবা ট্র্যাডিশনাল গেট যা মুক্তা নদীর পারে ছিল এবং যা পরবর্তীতে সিল্ক রোড হয়ে এখানে ব্যবসায়ীদের আগমন ঘটে। এখানে ১২০০ থেকে ১২৫০ সালে প্রায় ৫০০০ রিফুজি মঙ্গোলিয়ানরা বসবাস শুরু করে। ধারণা করা হয় ম্যাকাও নামটি এসেছে A Ma Gao, place of A Ma, সমুদ্র দেবতাদের কাছ থেকে। এটি ছিল চীনে সর্বশেষ ইউরোপীয় কলোনি। পর্তুগীজ ব্যবসায়ীরা ১৫৫০ সালের দিকে মাকাওয়ে প্রথম বসতি স্থাপন করে। ১৫৫৭ সালে চীনের সম্রাট মাকাওকে বাণিজ্য বন্দর হিসেবে পর্তুগালের কাছে ইজারা দেন। প্রতি বছর ৫০০ teals করে চীনকে ইজারা দেয়া হতো। ১৮৮৭ সাল পর্যন্ত মাকাও চীনা প্রশাসনের অধীনে পর্তুগাল কর্তৃক শাসিত হয়েছিল। ১৮৮৭ সালে মাকাও পর্তুগীজ কলোনিতে রূপান্তরিত হয়। পর্তুগাল থেকে ওয়াইনারি, বিভিন্ন ধরনের পণ্য সামগ্রী এনে, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রপ্তানী করত এবং এশিয়া থেকে চা, মসলা জাতীয় দ্রব্য আমদানি করত । এখান থেকে পানি পথে গোয়া পর্যন্ত যাতায়াত করা হতো। ১৮৫০ সালে সর্বপ্রথম পর্তুগিজরা ম্যাকাওতে জুয়ার আড্ডা বসায় এবং পরবর্তী বছর থেকেই আড়াইশো টি ঘরে জুয়ার আড্ডা বসে, যাকে এশিয়ার জুয়ার আড্ডা খানা বলা হয়। শুধুমাত্র চীনের অধিবাসীরা এই শহরে জুয়া খেলার জন্য আসে, তারপর থেকে এশিয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা আসতে শুরু করে, এবং পরবর্তীতে এখানে শুরু হয় tourism of gambling। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে এই বন্দরনগরী যোগসুত্র তৈরি করে, যেখানে চীন ,ইন্ডিয়া, জাপান ও ইউরোপ থেকে পণ্য সামগ্রী এখানে এনে বাণিজ্য করা হয়। তবে এখানে সবচেয়ে প্রথম মডার্ন ক্যাসিনো হচ্ছে লিসবোয়া যা ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে রুমের সংখ্যা ২৩৬২ টি।

১৭ই জুলাই ২০১০ সালে আমার ম্যাকাও যাওয়া হয়। এয়ার এশিয়া প্লেনে করে কুয়ালালামপুর থেকে ফ্লাই করি মাত্র 28 আমেরিকান ডলারে। রিটার্ন টিকেট ছিল সেনজেন শহর থেকে ব্যাংককে 30 শে জুলাই। অনেক কষ্ট করে ম্যাকাও এর ভিসা পেয়েছি কুয়ালালামপুর ম্যাকাও ভিসা কনস্যুলেট থেকে । মালয়েশিয়ার রেসিডেন্ট না থাকায় এম্বাসিকে পারডে ১০০ ডলার খরচ দেখিয়ে ১২০০ ডলারে ১২ দিনের ভিসা পাই, এই ভিসা নিতে ১৬ দিন সময় লেগেছিলো।

আমার ফ্লাইট ছিল খুব ভোর বেলায় রাত ১.৪৫ এ, এবং যখন ওখানে পৌঁছাই ভোর হয়নি। প্লেন থেকে রাতের জমকালো লাল-নীল আলোয় ম্যাকাও শহরটিকে আধুনিক এক স্বপ্নপুরী লাগছিল। জীবনে প্রথম এই এত আলোর লাল- নীল আধুনিক স্থাপত্যের নিদর্শন দেখা। সত্যিই অপরূপ দৃশ্য। ওই রাতেই পাশের সদ্য পরিচিত হওয়া দুজন ইন্দোনেশিয়ানদের ট্যাক্সিতে শহরে Fortuna Casino এসে পৌঁছায়। আমার আগে থেকে কোন হোটেল বুকিং ছিল না, তো আমি সেই ভোর বেলায় কোথাও চেক-ইন করতে পারলাম না। এখন আমি আমার ছোট ব্যাগ নিয়ে ঘুরতে লাগলাম। প্রায় প্রত্যেক ক্যাসিনোতে তখনো অনেক লোকের খেলছিল লাল চোখ নিয়ে। বিভিন্ন জায়গা ঘুরতে ঘুরতে চলে আসলাম Casino Macau Palace, সত্যি সেটি দেখতে একটি রাজপ্রসাদের মতো, যদি না কাউকে না বলা হয়, তাহলে ক্যাসিনোটিকে রাজপ্রাসাদ ভেবে ভুল করতেও পারে। ততক্ষণে সাতটা সাড়ে সাতটা বেজে গিয়েছে, হোটেলের ট্যুরিস্ট কাউন্টার থেকে জেনে নিলাম শহরের কোথাও হোস্টেল আছে কিনা, তারপর তারা আমাকে একটি অল টাউনের এড্রেস দেয়, যেখানে খুব সস্তায় হোটেল পাওয়া যাবে। তারপর হাঁটতে হাঁটতে আর বড় বড় বিল্ডিং দেখতে দেখতে The Sands Macau সমুদ্রের পাশে অবস্থিত, এখান থেকে সমুদ্রস্নানের অনেক ব্যবস্থা রয়েছে ওখানে চলে আসলাম।
তারপর কিছুক্ষন সমুদ্রের পারে বসে সাড়ে নটার দিকে ওল্ড টাউন এর দিকে রওনা হলাম বাসে। ততক্ষণে আমার বেশ খিদে পেয়ে গিয়েছিল। ওখানকার চাইনিজ রেস্টুরেন্টে সকালের নাস্তাটা সেরে ফেললাম চাইনিজ ডাম্পলিং স্যুপ দিয়ে। তারপর সাড়ে এগারোটা নাগাদ হোটেলটি খুঁজে পেলাম, তখনো চেক আউট হয়নি। ছোট্ট গেস্ট হাউজের ছোট্ট চেয়ারে বসে থাকলাম বারোটা নাগাদ চেক আউট হলেই রুম দিবে, সারা শহর ঘুরে ঘুরে এই জায়গাটায় ১৫০ ম্যাকাও ডলারে রুম পেলাম, কিন্তু শাওয়ার- টয়লেট শেয়ার। তবে আমি মহাখুশি এর থেকে আর কম দামে কিছু পাওয়া যাবে না। রুমে ঢুকে এমন এক ঘুম দিলাম,পাঁচটার সময় উঠলাম। তারপর রেডি হয়ে শহর দেখতে নেমে গেলাম। সুপার মার্কেট থেকে কিছু খাবার খেয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম এখানে অধিকাংশ মানুষজন চাইনিজ, পর্তুগিজ, ইউরোপিয়ান, কিন্তু যারা এখানে চাকরি করে তারা অধিকাংশই ফিলিপিনো। এরই মাঝে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম Golden Dragon Casino তে, ড্রাগন অফ fortune, যেখানে চার মিনিটের একটি show দেখানো হয়, যা কিনা সিলিংয়ে বিভিন্ন আকার আকৃতি ধারণ করে, যা সত্যিই অপরূপ। একটা জিনিস খেয়াল করলাম: প্রতিটি হোটেলের এন্টারটেইনমেন্ট, নকশা, কালার সবকিছুতেই নিজস্বতা ও ভিন্নতা রয়েছে। প্রতিটি অফার করেছে একটি জাতি, একটি দেশের ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও ইতিহাস। যেমন: Greek Mythology Casino, গ্রিক সভ্যতা কে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। MGM Macau হোটেলে লাইট সাউন্ড শো দেখানো হয়, সাতটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় একবার করে। তাই দেখতে ছুটে গেলাম। তবে Wynn Macau তে দেখানো হয় ট্রি অফ প্রসপারিটি, যা ২০০০ ডালপালা এবং ৯৮০০০ পাতা নিয়ে ঠিক মাটির নিচ থেকে উঠে আসে একটি গাছ, ৭ মিনিটের শো, আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে, যা আমি আর পৃথিবীর কোথাও দেখিনি। মাত্র ৩৩ কিলোমিটারের এশিয়ার 'লাস ভেগাস' বা জুয়ার শহরটিতে রয়েছে ৪২ টি হোটেল, তার মধ্যে ৩৮ টি হোটেলে রয়েছে ক্যাসিনো। অন্যদিকে, The Venetian Macau এটা রোম শহরের একটি প্রতীক। Cotai Strip Babylon Casino তে ব্যাবিলনের সেই আদি সভ্যতা কে সাজানো হয়েছে ইজিপশিয়ান সভ্যতা সহ। Casino Crystal Palace, Inn Emperor Palace এসব দেখতে দেখতে অনেক রাতে হোটেলে ফিরলাম।
পরের দিন সকাল ৯ টার দিকে নাস্তা করে আসলাম নতুন আধুনিক সভ্যতার খোঁজে Diamond Casino at Holiday, Casino Galaxy, Rio Casino, এটা ব্রাজিলের কালচার কে ধারণ করা হয়েছে। এখানে একটি থেকে আরেকটি হোটেলে বিশাল বড় আকৃতির যেতে অনেক সময় লাগে। Galaxy Star world, গ্যালাক্সির স্টাইলে সাজানো, কখনো বা সুপারম্যান, Galaxy Waldo Hotel কোন কিছুর অভাব নেই। পর্যটকদের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান কিংবা নারীদের জন্য চোখ ধাঁধানো সুন্দর সুন্দর শপিং মলে আটকে রাখার যথেষ্ট চেষ্টা রয়েছে। Casino Pharaoh’s Palace, Casino Ponte 16, Casino Marina at Taipei, Crown Casino Taipa MJC, Casino Taipei, City of Dreams তে দেখানো হয়, ড্রাগন স্টেনজার যা আইকনিক মাল্টিমিডিয়া অ্যাট্রাকশন এক্সপ্লোর করে ভার্চুয়াল এবং সাউন্ড, অনেক সিনারি। Galaxy Cotai Mega, Resort Galaxy Grand Waldo, Casino Oceanus আর এসব ক্যাসিনোর মধ্যে শুধুমাত্র চাইনিজদের আনাগোনা, মাঝে মাঝে কিছু ইউরোপিয়ানদের চোখে পড়ে।যতটুক দেখেছি বড় বড় খেলার দানের সময় চাইনিজদের অবস্থান বেশি। এবং প্রতিটি ক্যাসিনোতে রয়েছে হোটেল, শপিং মল, রেস্টুরেন্ট ও নানা ধরনের শো যা কিনা সম্পূর্ণ ফ্রিতে দেখানো হয়, কখনো বা ইটালি শহর কিংবা প্যারিস, কিংবা আবার পর্তুগালের লিসবোয়া সাজে রয়েছে প্রতিটি ক্যাসিনো, সন্ধ্যায় অপরূপ রূপে সেজে ওঠে এই ম্যাকাও সিটি। একটি বন্দর নগরী কে কিভাবে আদি ঐতিহ্য, আধুনিকতার সমন্বয় গড়ে ওঠা একটি শহর। যা কিছুটা হলেও লাসভেগাস থেকে প্রাণ আছে। এইভাবে আমার দ্বিতীয় দিনটিও কেটে যায়।
ম্যাকাও টাওয়ার থেকে শহরটির সৌন্দর্য টি খুব সুন্দর ভাবে উপভোগ করা যায়। একদিকে যেমন জুয়ার আসর রয়েছে তেমনি, রয়েছে সেন্ট অগাস্টিনের গির্জা , হলি হাউস অফ মেরি, Ruins of St. Paul's যা 1650 থেকে 1660 নির্মাণ করা এটাকে মেইন আকর্ষন বলা যেতে পারে।তৃতীয় দিনের আকর্ষণ ছিল সকাল থেকে পর্তুগীজদের ইতিহাস নিয়ে, তার দরুন যাওয়া হয় Mount Fortress & Museum of Macau দেখতে। ওখান থেকে আসার সময় অনেক লোকের ভিড় দেখে একটি পর্তুগিজ রেস্টুরেন্টে খাওয়া হয়। অসাধারণ সেই খাবার। senado square কে বলা হয় মেইন স্কয়ার যা শহরের মধ্যে খানে অবস্থিত, অপরূপ ভাবে সাজানো সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো মোজাইক করা রয়েছে ,আর তার মধ্যেখানে ওয়াটারফল আরো মন মুগ্ধ করে তুলেছে। সেখানে বসে অনেকটাই সময় পার করলাম, শুধুমাত্র এই জায়গাটিতে আসলেই ট্যুরিস্টদের দেখা যায় বিভিন্ন বর্ণের ইউরোপিয়ান থেকে শুরু করে এশিয়ান পর্যন্ত। এর পাশেই পর্তুগিজ খাবারের কিছু রেস্টুরেন্ট আছে যা সেই ১৭ শতাব্দী থেকে আজও চলে আসছে। আজকের চিন্তা করেছে কোন প্রাণহীন লাল বিল্ডিং দেখব না, তখন পরিচয় হয় কমল নামে এক বন্ধুর সাথে। সে এসেছে তার গ্রূপ এর সাথে পুনা থেকে। তার আমন্ত্রণে রাতের ডিনার ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট যাওয়া হয়, কিছুটা আড়ষ্টতা ছিল ১২-১৩ জন ছেলের মধ্যখানে একমাত্র মেয়ে আমি। তারা সবাই আমাকে পুনা ও বম্বেতে আমন্ত্রণ জানায়। আমার ডিনারের বিল পেমেন্ট করতে চাইলে তারা আমাকে বাধা দেয়, ইন্ডিয়ান বাংলাদেশী কিংবা পাকিস্তানি, মুসলিম কালচারে মেয়েদেরকে অবলা ভাবা হয় বলে তাদের কাছ থেকে কখনোই দিলানা, কিন্তু ইউরোপিয়ান, ওয়েস্টার্ন কালচারে যে যার বিল পেমেন্ট করে। আমি একটু আরষ্টতা বোধ করায় তাড়াতাড়ি হোটেলে চলে আসি সেদিন রাতে। এখানে একসাথে রয়েছে চাইনিজ কিংবা ইতালিয়ান খাবারের রেস্টুরেন্ট, আর বাংলাদেশীদের জন্য তো ইন্ডিয়ান খাবারের রেস্টুরেন্ট রয়েছে। তবে এখানে খাবার এবং থাকা অনেক এক্সপেন্সিভ তুলনামূলকভাবে লাসভেগাসের থেকে। সাধারণত এখানে 150 আমেরিকান ডলারের নিচে কোন হোটেল পাওয়া যায় না, আর খাবার খেতে হলে প্রত্যেকবারই গুনতে হয় 20 থেকে 50 ডলার। ইন্টারটেনমেন্ট অনেক অংশে ফ্রি আছে, তার সঙ্গে রয়েছে বড় থিয়েটার যেখানে দেখানো হয় চাইনিজ অপেরা কিংবা পর্তুগিজ অপেরা থেকে শুরু করে ইটালিয়ান অপেরা সারা বছর ধরেই। আমার এই ম্যাকাও শহরটিতে যাওয়া হয়েছিল ২০১০ সালের ১৭ই জুলাই, মাত্র তিন দিনের জন্য, কিন্তু পরে আমি এখানে ৪ দিন থেকে যাই, জুয়ার ভাগ্য ভালো থাকায়। তবে এখনো আমার স্মৃতিতে গেঁথে আছে সেই ম্যাকাওয়ের আধুনিক শহরটি।


No comments:
Post a Comment